সুখ-দুঃখ ও বিপদ-আপদ মানুষের পার্থিব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবনে নেমে আসা প্রতিটি কষ্ট ও প্রতিকূলতা মূলত পরম করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের পরীক্ষা। বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোনো কিছুকে চরম বিপর্যয় মনে হলেও তার আড়ালে আল্লাহর বিশেষ হিকমত, অসীম করুণা ও সূক্ষ্ম কল্যাণ নিহিত থাকে। মানুষের মূল দায়িত্ব হলো সার্বিক অবস্থায় আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর অটল বিশ্বাস রাখা এবং যে কোনো কঠিন মুহূর্তে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা।
ঈমানের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো ভালো-মন্দ সর্বাবস্থায় আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরে বিশ্বাস স্থাপন করা। মানবীয় সীমিত জ্ঞান দিয়ে আল্লাহর অসীম হেকমত ও মহাবিশ্বের বিশাল পরিকল্পনা পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। অনেক সময় আমরা কোনো বিষয়কে নিজের জন্য ক্ষতিকর বা অপছন্দনীয় মনে করি, অথচ আল্লাহ তাআলা তার ভেতরেই আমাদের জন্য স্থায়ী কল্যাণ লিখে রাখেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
‘হতে পারে, তোমরা এমন কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আবার হতে পারে, তোমরা এমন কোনো বিষয় পছন্দ করছ, অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২১৬)
ইমানের পরীক্ষা ও আল্লাহর সাহায্য
পার্থিব জীবন কোনো চূড়ান্ত প্রতিদানের স্থান নয়, বরং তা পরীক্ষার ময়দান। ইমানদারদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি ও সত্যবাদিতা প্রমাণের জন্য যুগে যুগে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। কঠিন সময়ের পরই আল্লাহর সাহায্য ত্বরান্বিত হয়। কুরআনের নির্দেশ—
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم ۖ مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّىٰ يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَىٰ نَصْرُ اللَّهِ ۗ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
‘তোমরা কি মনে করেছ যে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ তোমাদের আগে যারা চলে গেছে তাদের মতো বিপদ-আপদ তোমাদের ওপর আসেনি? তাদের ওপর দুর্দশা ও কষ্ট এসেছিল এবং তারা এতটাই বিচলিত হয়েছিল যে নবী ও তার সাথে থাকা মুমিনরা বলে উঠেছিলেন, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২১৪)
কুরআনের আরও নির্দেশ—
أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ ۞ وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۖ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ
‘মানুষ কি মনে করে, তারা শুধু এই কথা বললেই ছেড়ে দেওয়া হবে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? তাদের আগের লোকদেরও আমি পরীক্ষা করেছি। আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।’ (সুরা আল-আনকাবুত: আয়াত ২-৩)
জীবন, মৃত্যু ও দায়িত্ববোধ
মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৃত্যু কোনো চিরস্থায়ী বিপর্যয় নয়, বরং আল্লাহর সান্নিধ্যে ফিরে যাওয়ার মাধ্যম। মানুষের নিয়ন্ত্রণ কেবল তার বর্তমান মুহূর্ত ও আমলের ওপর রয়েছে। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই ধনী-দরিদ্র কিংবা মুমিন-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার জন্য ভালো কাজ করে দিন পার করা জরুরি।
আল্লাহ বান্দার ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না এবং কারো প্রতি জুলুম করেন না। কুরআনের নির্দেশ—
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۚ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ ۗ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا ۚ أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
‘আল্লাহ কোনো প্রাণীকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। সে যে ভালো কাজ করে, তার সুফল সে পাবে এবং যে মন্দ কাজ করে, তার শাস্তিও সে ভোগ করবে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যদি ভুলে যাই কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুল করি, তাহলে আমাদের পাকড়াও করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেমন বোঝা চাপিয়েছিলে, আমাদের ওপর তেমন বোঝা চাপিয়ে দিয়ো না। হে আমাদের প্রতিপালক! এমন কোনো দায়িত্ব আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপগুলো ক্ষমা কর, আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হও এবং আমাদের ওপর রহমত বর্ষণ কর। তুমিই আমাদের সর্বোচ্চ অভিভাবক। অতএব সত্য অস্বীকারকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য কর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৮৬)
পার্থিব প্রাচুর্য ও আখেরাতের বিচার
দুনিয়াতে কাউকে আপাতদৃষ্টিতে সুখী ও ভোগ-বিলাসে মগ্ন দেখলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট। বস্তুগত সাফল্য সবসময় আল্লাহর ভালোবাসা বা জান্নাতের নিশ্চয়তা বহন করে না। এমনও হতে পারে যে, পার্থিব জীবনে তাদের সমস্ত প্রতিদান পেয়ে যাওয়ার ফলে আখেরাতে তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে।
তবে ধনসম্পদ থাকা মানেই তা ক্ষতিকর নয়; সৎকর্মশীল ধনীরা সমাজে প্রশংসনীয়। কিন্তু ঈমান ও সৎকাজ ছাড়া কেবল পার্থিব সম্পদ মানুষকে আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ করতে পারে না। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত সোহাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلاَّ لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
‘মুমিনের বিষয়টি কতই না চমৎকার! তার প্রতিটি কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া আর কারো জন্য এই সৌভাগ্য নেই। সে যদি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করে তবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি কোনো দুঃখ-কষ্ট বা বিপদে পড়ে তবে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়ে যায়।’ (মুসলিম ২৯৯৯)
জীবনের উত্থান-পতন, লাভ-ক্ষতি ও বিপদ-আপদ এলে আমাদের ইমানী চেতনার শানিত রূপ। বিপদে ধৈর্য ধারণ ও সুখে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে একজন মুমিন পার্থিব জীবনের সব পরীক্ষাকে আখেরাতের স্থায়ী সাফল্যের পুঁজিতে পরিণত করতে পারেন। আল্লাহর নিখুঁত ন্যায়বিচার ও অসীম প্রতিদানের ওপর আস্থা রাখাই মুমিনের প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি।